ইন্দো-আর্যদের আসার পর অঙ্গ, বঙ্গ এবং মগধ রাজ্য গঠিত হয় খ্রিষ্টপূর্ব দশম শতকে । এই রাজ্যগুলি বাংলা এবং বাংলার আশেপাশে স্থাপিত হয়েছিল । অঙ্গ বঙ্গ এবং মগধ রাজ্যের বর্ণনা প্রথম পাওয়া যায় অথর্ববেদে প্রায় ১২০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে । মহাভারতে পৌন্ড্র রাজ বাসুদেব এর উল্লেখ পাওয়া যায় ।
৩২৭-৩২৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দে গ্রিক বীর আলেকজান্ডারের ভারত আক্রমণের সময় থেকে প্রকৃত ইতিহাস পাওয়া যায়। গ্রিক লেখকদের কথায় বাংলাদেশে 'গঙ্গারিডাই' নামে একটি শক্তিশালী জাতির বাসস্থান ছিল ভাগীরথী ও পদ্মার মধ্যবর্তী অঞ্চলে। গ্রিক গ্রন্থকারগণ গঙ্গারিডই ছাড়াও প্রাসিতায় নামে অপর এক জাতির উল্লেখ করেছেন। আলেকজান্ডারের আক্রমণের সময় বাংলার রাজা মাধাদি দেশ জয় করে পাঞ্জাব পর্যন্ত রাজ্য বিস্তার করেছিলেন। তিনি ছিলেন পাটালিপুত্রের নন্দবংশীয় কোন রাজা।
জেনে নিই
- প্রাচীন বাংলা মৌর্য শাসনের প্রতিষ্ঠাতা সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য। এটি সর্বভারতীয় প্রথম সাম্রাজ্য।
- চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যকে বলা হয় ভারতের প্রথম সম্রাট। চন্দ্রতপ্ত মৌর্যের রাজধানী ছিল- পাটালিপুত্র।
- মহাস্থানগড়ে মৌর্য বংশ প্রতিষ্ঠিত হয় ৩২২ খ্রিস্টপূর্বাব্দে নন্দবংশকে পরাজিত করে।
- আলেকজান্ডারের ভারত ত্যাগের পর তার সেনাপতি সেলুকাসকে পরাজিত করেন- চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য।
- গ্রিক দূত মেগাস্থিনিসকে দূত হিসেবে চন্দ্রগুপ্তের রাজদরবারে প্রেরণ করেন- সেলুকাস।
- গ্রিক পরিব্রাজক মেগাস্থিনিস কয়েক বছর অবস্থান করে মৌর্য শাসন সম্পর্কে তাঁর অভিজ্ঞতা ইন্ডিকা নামক গ্রন্থে লিপিবন্ধ করেন।
- ইন্ডিয়া নামকরণ করেন- প্রাচীন গ্রীকরা।
- মৌর্যবংশের মোট শাসক ছিলেন- ৯ জন।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
বিন্দুসার মৌর্য বংশের দ্বিতীয় শাসক এবং রাজা চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের পুত্র। পিতা চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের মৃত্যুর পর উত্তরাধিকারসূত্রে পিতৃ-রাজত্ব লাভ করেন বিন্দুসার। সিংহাসন আরোহণকালে তিনি অমিত্রঘাত' অর্থাৎ শত্রু নিধনকারী উপাধি লাভ করেন। বিন্দুসারের রাজত্বকালের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছিল তক্ষশীলার বিদ্রোহ (পাকিস্তান)। তক্ষশীলার এই বিদ্রোহ দমন করেছিলেন যুবরাজ অশোক। বিন্দুসারের রাজত্বকালে একমাত্র শ্রেষ্ঠ অর্জন ছিল- কলিঙ্গ জয়। সম্রাট অশোকও উত্তরাধিকার সূত্রে সিংহাসনের অধিকারী হয়েছিলেন।
উত্তর বাংলায় মৌর্য শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। সম্রাট অশোকের (তৃতীয় শাসক) রাজত্বকালে। এসময় অঞ্চলটি মৌর্যদের একটি প্রদেশে পরিণত হয়েছিল। এ প্রদেশের রাজধানী ছিল প্রাচীন পুণ্ড্রনগর। সম্রাট অশোকের একটি শিলালিপি পাওয়া যায় মহাস্থানগড়ে। সম্রাট অশোক সিংহাসন আরোহনে নিজ ভ্রাতাদের নির্মমভাবে হত্যা করেন ফলে তার উপাধি হয় চণ্ডাশোক। সম্রাট অশোক কলিঙ্গ যুদ্ধের ভয়াবহতা দেখে বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেন। সম্রাট অশোক বৌদ্ধধর্মকে বিশ্বধর্মে পরিণত করেন। এজন্য তাকে বৌদ্ধ ধর্মের কনস্ট্যানটাইন (রোমান সম্রাট) বলা হয়।
চাণক্য রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও অর্থনীতি বিষয়ে একজন দিকপাল ছিলেন। চাণক্য ছিলেন চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য ও বিন্দুসারের প্রধানমন্ত্রী ও উপদেষ্টা। চাণক্যের ছদ্মনাম 'কৌটিল্য' আর উপাধি- ‘বিষ্ণুখণ্ড’। কৌটিল্য রচিত গ্রন্থের নাম- 'অর্থশাস্ত্র' । ভারত চলে চাণক্য নীতিতে।
তার একটি উক্তিঃ “যে রাজা শত্রুর গতিবিধি সম্পর্কে ধারণা করতে পারে না এবং শুধু অভিযোগ করে যে তার পিঠে ছুরিকাঘাত করা হয়েছে, তাকে সিংহাসনচ্যুত করাই উচিত।"
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
গুপ্ত যুগে বাংলা ভারতের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে।
গুপ্ত সাম্রাজ্য
ভারতের ইতিহাসে গুপ্তযুগ সামগ্রিকভাবে 'স্বর্ণযুগ' হিসেবে খ্যাত। এ যুগে ভারতের কলা, স্থাপত্য ও ভাস্কর্য এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছায়। এ যুগের ভাস্কর্যকে ধ্রুপদী ভাস্কর্য বলা হয়।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
ভারতের ইতিহাসে স্বর্ণযুগ হিসেবে বিবেচনা করা হয় গুপ্ত যুগকে। গুপ্ত বংশের নামমাত্র প্রতিষ্ঠাতা শ্ৰীগুপ্ত । গুপ্ত বংশের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা বলা হয় প্রথম চন্দ্রগুপ্তকে। প্রথম চন্দ্রগুপ্তের উপাধি মহারাজাধিরাজ। চন্দ্রগুপ্ত সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল পাটালিপুত্রে। গুপ্তদের সময়ে রাজতন্ত্র ছিল সামন্ত নির্ভর। গুপ্ত রাজাদের অধীনে বড় কোনো অঞ্চলের শাসককে বলা হতো মহাসামন্ত। মৌর্যদের মতো এদেশে গুপ্তদের রাজধানী ছিল মহাস্থানগড়ের পুণ্ড্রনগর।
প্রথম চন্দ্রগুপ্ত (৩২০-৩৪০ খ্রি.) ছিলেন ভারতে গুপ্তবংশের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা।
সমুদ্র গুপ্তের শাসনকাল ছিল ৩৪০-৩৮০ খ্রিস্টাব্দ। গুপ্ত বংশের শ্রেষ্ঠ শাসক সমুদ্রগুপ্ত সমগ্র বাংলা জয় করেন। তাঁকে প্রাচীন ভারতের "নেপোলিয়ন" বলা হয়। সমুদ্রগুপ্তের রাজত্বকালে সমগ্র বাংলা জয় করা হলেও সমতট ছিল করদ রাজ্য।
সমুদ্রগুপ্ত (৩৪০-৩৮০ খ্রি.) ছিলেন গুপ্ত বংশের শ্রেষ্ঠ রাজা। তাঁকে 'প্রাচীন ভারতের নেপোলিয়ন' বলা হয়। গুপ্ত অধিকৃত বাংলার রাজধানী ছিল পুণ্ড্রনগর।
দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত (৩৮০-৪১৫ খ্রি.) সমুদ্রগুপ্তের মৃত্যুর পর পাটলিপুত্রের সিংহাসনে বসেন। তিনি মালবের উজ্জয়িনীতে সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় রাজধানী স্থাপন করেন। 'বিক্রমাদিত্য' ছিল তাঁর উপাধি। তাঁর শাসনকালে গুপ্ত সাম্রাজ্য সর্বাধিক বিস্তৃত হয়। অনেক প্রতিভাবান ও গুণী ব্যক্তি বিক্রম দরবারে সমবেত হয়েছিলেন। এঁদের মধ্যে প্রধান নয়জনকে 'নবরত্ন' বলা হয় যথা- কালিদাস, অমরসিংহ, বরাহমিহির প্রমুখ। মহাকবি কালিদাস সংস্কৃত ভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি ও নাট্যকার। তাঁর রচনাবলির মধ্যে মালবিকাগ্নিমিত্র, অভিজ্ঞানশকুন্তল নাটক, রঘুবংশ ও কুমারসম্ভব মহাকাব্য এবং মেঘদূত ও ঋতুসংহার গীতিকাব্য সাহিত্যমাধুর্যে অতুলনীয়। অমরসিংহ ছিলেন সংস্কৃত কবি, ব্যাকরণবিদ এবং প্রাচীন ভারতের সর্বশ্রেষ্ঠ অভিধান প্রণেতা। তাঁর প্রসিদ্ধ সংস্কৃত অভিধান 'অমরকোষ'। বরাহমিহির ছিলেন বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'বৃহৎ সংহিতা'।
৬ষ্ঠ শতকের প্রথমার্ধে ভারতে বিশাল গুপ্ত সম্রাজ্যের পতন ঘটে। মধ্য এশিয়ার দুর্ধর্ষ যাযাবর জাতি হুনদের আক্রমণে টুকরো টুকরো হয়ে যায় গুপ্ত সাম্রাজ্য।
সমুদ্রতন্ত্রের মৃত্যুর পর পাটালিপুত্রের সিংহাসনে বসেন দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত। তাঁর উপাধি ছিল 'বিক্রমাদিত্য'। তিনি নবরত্নের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন।
যেমনঃ
- কাপিলাস (মেঘনৃত)
- অমরসিংহ (অমরকোষ)
- বরাহমিহির (বৃহৎ সংহিতা)
দ্বিতীয় চন্দ্রখণ্ডের শাসনামলে চৈনিক তীর্থযাত্রী ফা-হিয়েন ভারতবর্ষে এসেছিলেন। ফা-হিয়েন-ই প্রথম চীনা পরিব্রাজক হিসেবে ভারতবর্ষে এসেছিলেন। তাঁর ভারত সফরের ৭টি বইয়ের মধ্যে ফো-কুয়ো-কিং বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
গৌড় রাজ্য ছিল বাংলা অঞ্চলের প্রথম স্বাধীন রাজ্য, যার প্রতিষ্ঠাতা ও শক্তিশালী শাসক ছিলেন রাজা শশাঙ্ক , যিনি গুপ্ত সাম্রাজ্যের অধীনে সামন্ত হিসেবে শুরু করে পরে স্বাধীন হন এবং তাঁর রাজধানী ছিল কর্ণসুবর্ণ (বর্তমান মুর্শিদাবাদে)। শশাঙ্ক সমগ্র বাংলা অঞ্চলকে একত্রিত করে একটি শক্তিশালী সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন, যা বাংলার ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, এবং তিনি হর্ষবর্ধনের সমসাময়িক ছিলেন।
শশাঙ্ক প্রথম গৌড়ে রাজ্য স্থাপন করেন। শশাঙ্কের ধর্ম ছিল- শৈব। তিনি ছিলেন প্রাচীন বাংলার ইতিহাসে প্রথম সার্বভৌম নৃপতি রাজা । গুপ্তদের অধীনে বড় অঞ্চলের শাসকদের পদবি ছিল- মহাসামন্ত। শশাঙ্কের রাজধানীর নাম- কর্ণসুবর্ণ (মুর্শিদাবাদে অবস্থিত)। শশাঙ্ক ছিলেন গুপ্ত রাজা মহাসেনগুপ্তের একজন মহাসামন্ত অথবা ভ্রাতুষ্পুত্র। হিউয়েন সাঙ রাজা শশাঙ্ককে বৌদ্ধ ধর্মের নিগ্রহকারী হিসেবে অভিহিত করেছেন। শশাঙ্ক মৃত্যুবরণ করেন- ৬৩৭ খ্রিস্টাব্দের দিকে ।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
মাৎস্যন্যায় (Matsyanyayam)
শশাঙ্কের পর দীর্ঘদিন বাংলায় কোনো যোগ্য শাসক ছিলনা। ফলে রাজ্যে বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতা দেখা দেয়। কেন্দ্রীয় শাসন শক্তভাবে ধরার মত কেউ ছিলনা। সামন্ত রাজারা প্রত্যেকেই বাংলার রাজা হওয়ার কল্পনায় অস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে থাকেন। এ অরাজকতাপূর্ণ সময় (৭ম-৮ম শতক) কে পাল তাম্র শাসনে আখ্যায়িত করা হয়েছে 'মাৎস্যন্যায়' বলে। সন্ধ্যাকর নন্দীর 'রামচরিতম' কাব্যেও পাল বংশের অব্যবহিত পূর্ববর্তী সময়ের বাংলার নৈরাজ্যকর অবস্থাকে মাৎসন্যায়ম্ বলে উল্লেখ করা হয়। পুকুরে বড় মাছগুলো শক্তির দাপটে ছোট মাছ ধরে ধরে খেয়ে ফেলার বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিকে বলে 'মাৎস্যন্যায়'। বাংলার সবল অধিপতিরা এমনি করে ছোট ছোট অঞ্চলগুলোকে গ্রাস করেছিল।
শশাঙ্কের মৃত্যুর পর বাংলার ইতিহাসে প্রায় ১০০ বছর (সপ্তম-অষ্টম শতক) ধরে এক দুর্যোগপূর্ণ অন্ধকারময় যুগের সূচনা সময়কালকে মাৎস্যন্যায় বলা হয়। বাংলার অরাজকতার সময়কালকে পাল তাম্রশাসনে আখ্যায়িত করা হয়েছে মাৎস্যন্যায়। পুকুরে বড় মাছ ছোট মাছকে ধরে গিলে ফেলার মতো বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিকে বলে মাৎস্যন্যায়। এ অরাজকতার যুগ চলে একশ বছরব্যাপী। অষ্টম শতকের মাঝামাঝি এ অরাজকতার অবসান ঘটে পাল রাজত্বের উত্থানের মধ্য দিয়ে। [তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় (দশম শ্রেণী)]
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
হর্ষবর্ধনের রাজত্বকালের চীনা বৌদ্ধ পণ্ডিত হিউয়েন সাঙ ভারত সফরে আসেন। হিউয়েন সাঙ নালন্দা মহাবিহারের অধ্যক্ষ শীলভদ্রের কাছে ১৪ বছর বৌদ্ধ ধর্মশাস্ত্র অধ্যয়ন করেন। হিউয়েন সাত সিন্ধি নামে এক গ্রন্থ রচনা করেন। নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন অধ্যাপক নাগার্জুন, আর্যদেব, শীলভদ্র, ধর্মপাল। হিউয়েন সাত রাজা শশাঙ্ককে বৌদ্ধধর্ম বিদ্বেষী বলে আখ্যায়িত করেন। সভাকবি বানভী হর্ষবর্ধনের জীবনীমূলক গ্রন্থ 'হর্ষচরিত' রচনা করেন।
হর্ষবর্ধন (৬০৬ - ৬৪৭ খ্রি.) পুষ্যভূতি বংশের শ্রেষ্ঠ রাজা। হর্ষবর্ধনের সভাকবি ছিলেন বানভট্ট। বানভট্টের বিখ্যাত গ্রন্থ 'হর্ষচরিত'।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
প্রাচীন ও মধ্যযুগে বাংলার প্রাকৃতিক সম্পদ, উর্বর ভূমি, বাণিজ্য ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের আকর্ষণে বহু বিদেশি পরিব্রাজক ও পর্যটক বাংলায় আগমন করেন। তাঁদের ভ্রমণবৃত্তান্ত থেকে তৎকালীন বাংলার সমাজ, অর্থনীতি, ধর্ম ও জীবনযাত্রা সম্পর্কে মূল্যবান ঐতিহাসিক তথ্য পাওয়া যায়।
গ্রিক পর্যটক মেগাস্থিনিস খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে মৌর্য সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের রাজদরবারে অবস্থান করেন। তাঁর রচিত গ্রন্থ ইন্ডিকা-তে মৌর্য যুগের প্রশাসন, সমাজ ও অর্থনৈতিক অবস্থার বর্ণনা পাওয়া যায়। যদিও বাংলায় তাঁর সরাসরি আগমনের সুস্পষ্ট প্রমাণ নেই, বৃহত্তর মৌর্য সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হিসেবে বাংলার পরিস্থিতি সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া যায়।
চীনা বৌদ্ধ ভিক্ষু ফা-হিয়েন গুপ্ত যুগে বাংলায় ভ্রমণ করেন। তিনি তাম্রলিপ্ত বন্দরের উল্লেখ করেছেন এবং বাংলায় বৌদ্ধ ধর্মের প্রসার, অহিংস জীবনধারা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করেছেন। তাঁর বিবরণ থেকে জানা যায়, সে সময় বাংলায় বৌদ্ধ বিহার ও সন্ন্যাসীর সংখ্যা ছিল উল্লেখযোগ্য।
আরেক চীনা পর্যটক হিউয়েন সাং সপ্তম শতকে বাংলায় আগমন করেন। তিনি হর্ষবর্ধনের সমসাময়িক ছিলেন এবং নালন্দা মহাবিহারে অধ্যয়ন করেন। তাঁর ভ্রমণবৃত্তান্তে বাংলার প্রশাসন, শিক্ষা ও ধর্মীয় অবস্থার সুস্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায়।
মধ্যযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ মুসলিম পরিব্রাজক ইবনে বতুতা ১৩৪৬ খ্রিস্টাব্দে বাংলায় আসেন। তিনি সিলেট, সোনারগাঁও ও চট্টগ্রাম অঞ্চল ভ্রমণ করেন এবং বাংলার নদীপথ, বন্দর, বাজার ব্যবস্থা ও সুফিবাদের প্রভাব সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণ দেন। তাঁর লেখায় শাহজালাল (র.)-এর কথা বিশেষভাবে উল্লেখিত।
চীনা পরিব্রাজক ই-সিং সপ্তম শতকে বাংলায় ভ্রমণ করে এখানকার খাদ্যাভ্যাস, কৃষিকাজ ও লোকজ বিশ্বাসের বর্ণনা দিয়েছেন। পরে মা হুয়ান (১৫শ শতক) জেং হি–এর অভিযানের সঙ্গী হিসেবে বাংলায় আসেন এবং তাঁর বিবরণে বাংলার সমাজ, বাণিজ্য ও সংস্কৃতির বস্তুনিষ্ঠ চিত্র পাওয়া যায়।
এ ছাড়া ইতালির নিকালো মানুচ্চি, গ্রিক ভূগোলবিদ টলেমি, পর্তুগিজ দুয়ার্তে বারবোসা, ইংরেজ রালফ ফিচসহ বহু বিদেশি পর্যটক বাংলায় এসে এই অঞ্চলের সমৃদ্ধির কথা তুলে ধরেছেন। তাঁদের বিবরণ প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় বাংলার ইতিহাস রচনায় অমূল্য উৎস হিসেবে বিবেচিত।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
মেগাস্থিনিস ছিলেন একজন প্রাচীন গ্রীক ইতিহাসবিদ, কূটনীতিবিদ এবং হেলেনিস্টিক যুগে ভারতীয় নৃতত্ত্ববিদ ও অনুসন্ধানকারী। তিনি প্রাচীন গ্রিস এর একজন পর্যটক এবং ভূগোলবিদ। সিরিয়ার রাজা প্রথম সেলুকাসের দূত হিসেবে ভারতীয় রাজা চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য এর রাজদরবারে আসেন। তিনি যখন ভারতে আসেন তখন চন্দ্রগুপ্তের রাজদরবার ছিল ভারতের পাটালিপুত্র নামক স্থানে।
ফা-হিয়েন চীনের শানসি প্রদেশে আনুমানিক ৩৩১ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। তার আসল নাম ছিল কুঙ্গ। বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষা নেওয়ার পর ফা-হিয়েন রাখা হয়েছিল। তিনি চীন দেশের পরিব্রাজক ছিলেন। ৩৯৯ খ্রিষ্টাব্দের প্রথম দিকে চীনের রাজধানী চ্যাংগান থেকে ভারতের দিকে রওনা হয়েছিলেন। চ্যাংগান আর পুরনো নাম ছিল হাইফেং এবং পরবর্তীতে নামকরণ হয় সিয়ান।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
মা হুয়ান ছিলেন চীনা পরিব্রাজক। তিনি ১৪০৬ সালে গিয়াসউদ্দিন আযম শাহের আমলে উপমহাদেশে আসেন।
ইবনে বতুতা ছিলেন মুসলিম পরিব্রাজক। তিনি ১৩০৪ সালে মরোক্কোয় জন্মগ্রহণ করেন এবং মোহাম্মদ বিন তুঘলকের শাসনামলে ১৩৩৩ সালে ভারতবর্ষে আগমণ করেন। তিনি বাংলায় আসেন ফখরুদ্দিন মোবারক শাহের আমলে। ইবনে বতুতা প্রথমে বিদেশি পর্যটক হিসেবে বাঙ্গালা শব্দ ব্যবহার করেন। জীবনের নিত্যনৈমিত্তিক দ্রব্যের প্রাচুর্য ও স্বল্পমূল্য আর মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্য বতুতাকে আকৃষ্ট করলেও এ দেশএর আবহাওয়া তার পছন্দ হয়নি। এজন্য তিনি বাংলার নামকরণ করেন ধনসম্পদপূর্ণ নরক। ইবনে বতুতার কিতাবুল রেহালা নামক গ্রন্থে বাংলার অপরূপ সৌন্দর্যের বর্ননা পাওয়া যায়।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
প্রাচীন শাসনামলে বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে বিভিন্ন রাজবংশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
মৌর্য সাম্রাজ্য
ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম সাম্রাজ্যের নাম মৌর্য সাম্রাজ্য।
চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য (খ্রিষ্টপূর্ব ৩২৪ - ৩০০ অব্দ) মগধের সিংহাসনে আরোহণের মাধ্যমে ভারতে মৌর্য সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ভারতের প্রথম সম্রাট। পাটলিপুত্র ছিল তাঁর রাজধানী। তিনি চাণক্য নামে তক্ষশীলার এক তীক্ষ্ম বুদ্ধিসম্পন্ন ব্রাহ্মণকে তাঁর প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত করেন। তক্ষশীলা নগরী ছিল অধুনা পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশে অবস্থিত একটি প্রাচীন বিদ্যাচর্চার কেন্দ্র। চাণক্যের বিখ্যাত ছদ্মনাম কৌটিল্য, যা তিনি তাঁর বিখ্যাত সংস্কৃত গ্রন্থ 'অর্থশাস্ত্র' এ গ্রহণ করেন। রাষ্ট্রশাসন ও কূটনীতিকৌশলের সার সংক্ষেপ এই অর্থশাস্ত্র। চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য আলেকজান্ডারের সেনাপতি সেলিউকাসকে পরাজিত করে উপমহাদেশ হতে গ্রিকদের তাড়িয়ে দেন।
সম্রাট অশোক (খ্রিষ্টপূর্ব ২৭৩- ২৩২ অব্দ) এর রাজত্বকালে উত্তর বাংলায় মৌর্য শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। অঞ্চলটি মৌর্যদের একটি প্রদেশে পরিণত হয়েছিল। প্রাচীন পুণ্ড্রনগর ছিল এ প্রদেশের রাজধানী। 'কলিঙ্গের যুদ্ধ' সম্রাট অশোকের জীবনে ছিল এক মাইলস্টোন। যুদ্ধে কলিঙ্গ রাজ সম্পূর্ণ পরাজিত হন এবং এক লক্ষ লোক নিহত হয়। কলিঙ্গ যুদ্ধের রক্তস্রোত অশোকের মনে গভীর বেদনার রেখাপাত করে। তখন কৃতকর্মের অনুশোচনায় মূহ্যমান অশোক বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষা গ্রহণ করেন। তাঁর শাসনামলে বৌদ্ধধর্ম রাজধর্ম হিসাবে স্বীকৃতি পায়। তাঁর চেষ্টায় বৌদ্ধধর্ম বিশ্বধর্মের মর্যাদা পায়। এজন্য তাঁকে 'বৌদ্ধধর্মের কনস্ট্যানটাইন' বলা হয়।
রামাবতী ছিল বাংলার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাচীন নগরী। এটি পাল রাজবংশের অন্যতম শক্তিশালী শাসক রাজা রামপাল কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং তার রাজধানী হিসেবে ব্যবহৃত হতো। রামাবতী তার সৌন্দর্য এবং কৌশলগত অবস্থানের জন্য পরিচিত ছিল।
অবস্থান ও প্রতিষ্ঠা
রামাবতী নগরী ভাগীরথী নদীর পশ্চিম তীরে অবস্থিত ছিল। কিছু সূত্রমতে, এটি বর্তমান রামপালের সাথে সংযুক্ত। শহরটি রাজা রামপাল (আনুমানিক ১০৭৭-১১২৯ খ্রিষ্টাব্দ) প্রতিষ্ঠা করেন এবং এটিকে তিনি তাঁর রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলেন। প্রাচীন নথি অনুযায়ী, রামাবতীকে রামপাল এবং সমতট রাজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজধানী হিসেবেও উল্লেখ করা হয়।
সেন আমলে নবদ্বীপ বাংলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাকেন্দ্রে পরিণত হয়। সেন রাজবংশের শাসনামলে (খ্রিষ্টীয় একাদশ–দ্বাদশ শতক) নবদ্বীপ ছিল বাংলার রাজধানী। বিশেষত লক্ষণ সেনের আমলে নবদ্বীপ প্রশাসনিক কেন্দ্রের পাশাপাশি সংস্কৃত শিক্ষা, ধর্মচর্চা ও সাহিত্যচর্চার প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়। এই সময়ে নবদ্বীপে অসংখ্য টোল ও বিদ্যাপীঠ গড়ে ওঠে, যেখানে ব্যাকরণ, ন্যায়, স্মৃতি ও বেদশাস্ত্রের অধ্যয়ন হতো। সেন আমলে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের প্রভাব বৃদ্ধি পায় এবং নবদ্বীপ বাংলার হিন্দু সংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
মলখেড (প্রাচীন নাম: মান্যখেত; প্রাকৃতে "মান্নখেড")হল ভারতের কর্ণাটক রাজ্যের গুলবর্গা জেলার অন্তর্গত একটি গ্রাম। এই গ্রামটি উক্ত জেলার সেদাম তালুকে কাগিনা নদীর তীরে অবস্থিত। মলখেড ছিল খ্রিস্টীয় নবম ও দশম শতাব্দীতে রাষ্ট্রকূট রাজবংশের রাজধানী। রাষ্ট্রকূটদের পতনের পরেও পশ্চিম চালুক্য সম্রাটেরা ১০৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মলখেড থেকে রাজ্য শাসন করতেন।
পুষ্যভূতি রাজ্য
গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতনের পর উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত অঞ্চলে কতকগুলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যের উৎপত্তি ঘটে। এদের মধ্যে বর্তমান পাঞ্জাবের পূর্বাঞ্চলে পুষ্যভূতি রাজ্যের অভ্যুদয় অন্যতম।
প্রতিহার রাজবংশ, যা গুর্জর-প্রতিহার বা কনৌজের প্রতিহার নামেও পরিচিত, মধ্যযুগীয় ভারতের একটি শক্তিশালী রাজবংশ ছিল। শুরুতে তারা গুর্জরদেশ শাসন করলেও ৮১৬ খ্রিষ্টাব্দে ত্রিপক্ষীয় সংগ্রামে বিজয় লাভের মাধ্যমে কনৌজের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়। এর ফলে প্রতিহাররা উত্তর ভারতের একটি সাম্রাজ্যবাদী শক্তিতে পরিণত হয়। রাজবংশটির বিভিন্ন শাখা উপমহাদেশের নানা অঞ্চলে ছোট ছোট রাজ্য শাসন করত, যা তাদের রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারে সহায়ক ছিল।
পুষ্যভূতি রাজবংশ উত্তর ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজবংশ। এই বংশের উৎপত্তি সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য না থাকলেও ধারণা করা হয়, তাদের পূর্বপুরুষরা পূর্ব-পাঞ্জাবে বসবাস করতেন এবং পরবর্তীকালে থানেশ্বর অঞ্চলে রাজত্ব স্থাপন করেন। বাণভট্টের বিবরণ অনুযায়ী, পুষ্যভূতিই এই রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা। গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতন ও হুন আক্রমণের ফলে সৃষ্ট রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগে এই বংশের উত্থান ঘটে। প্রভাকরবর্ধনের শাসনামলে (৫৮০–৬০৫ খ্রি.) পুষ্যভূতি রাজবংশ একটি শক্তিশালী সার্বভৌম রাজ্যে পরিণত হয়। হর্ষবর্ধনের মৃত্যুর পর (৬৪৭ খ্রি.) এই রাজবংশের পতন ঘটে।
পুষ্যভূতি রাজবংশের উল্লেখযোগ্য শাসক ছিলেন প্রভাকরবর্ধন, রাজ্যবর্ধন এবং হর্ষবর্ধন। প্রভাকরবর্ধন রাজ্যের ভিত্তি সুদৃঢ় করেন, রাজ্যবর্ধন স্বল্পকাল শাসন করেন এবং হর্ষবর্ধনের শাসনামলে উত্তর ভারতে রাজনৈতিক ঐক্য ও সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধি লক্ষ করা যায়। হর্ষবর্ধনের শাসনকালকে পুষ্যভূতি রাজবংশের সর্বশ্রেষ্ঠ সময় বলা হয়।
কনৌজ বা কন্নৌজ ভারতের উত্তরপ্রদেশ রাজ্যের একটি প্রাচীন ও ঐতিহাসিক শহর। এর প্রাচীন নাম ছিল কান্যকুব্জ। এই শহরটি একসময় হর্ষবর্ধনের সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল এবং পরবর্তীকালে প্রতিহার রাজবংশের রাজনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কনৌজ সুগন্ধী উৎপাদন ও বাণিজ্যের জন্য বিখ্যাত এবং হিন্দি ভাষার কনৌজি উপভাষার উৎপত্তিস্থল হিসেবেও পরিচিত। প্রাচীন ভারতের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসে কনৌজের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কুষাণ সাম্রাজ্য
কনিষ্ক ছিলেন কুষাণ সাম্রাজ্যের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। তাঁর চিকিৎসক ছিলেন চরক।চরক আয়ুর্বেদ চিকিৎসা পদ্ধতির সংকলনগ্রন্থ রচনা করেন, যা 'চরক সংহিতা' নামে সমাধিক পরিচিত।
প্রাচীন যুগে বাংলা নামে কোনো অর্থও রাষ্ট্রের অস্তিত্ব ছিলনা। মূলত, বাংলার যাত্রা শুরু হয় বিক্ষিপ্ত জনপদগুলোর মধ্য দিয়ে। গুপ্ত, পাল ও সেন প্রভৃতি আমলের উৎকীর্ণ শিলালিপি ও বিভিন্ন সাহিত্যগ্রন্থে প্রাচীন বাংলায় প্রায় ১৬টি জনপদের কথা জানা যায় (বাংলায় ছিল ১০টি)। জনপদগুলোর মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন জনপদ হল পুত্র (পুণ্ড্রবর্ধন)। তবে প্রতিটি জনপদের সীমানা সবসময় একইরকম না থাকলেও প্রাচীন বাংলার চিরায়ত আবহ ধারন করে রেখেছে এই শত শত জনপদসমূহ।
বাংলার প্রাচীন জনপদ সমূহঃ
| প্রাচীন জনপদ | বর্তমান অঞ্চল |
| গৌড় | ভারতের মালদহ, মুর্শিদাবাদ, বীরভূম, বর্ধমান ও বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জ |
| বঙ্গ | ফরিদপুর, বরিশাল, পটুয়াখালী, বগুড়া, পাবনা, ঢাকা, কুষ্টিয়া, কুমিল্লা ও নোয়াখালীর কিছু অংশ এবং ময়মনসিংহের কিছু অংশ |
| পুণ্ড্র | বগুড়া, দিনাজপুর, রংপুর ও রাজশাহী অঞ্চল |
| হরিকেল | সিলেট এবং চট্টগ্রামের অংশবিশেষ |
| সমতট | কুমিল্লা ও নোয়াখালী |
| বরেন্দ্র | বগুড়া, দিনাজপুর, রাজশাহী ও পাবনা |
| চন্দ্রদ্বীপ | বরিশাল |
| উত্তর রাঢ় | মুর্শিদাবাদের পশ্চিমাংশ, বীরভূম, বর্ধমান জেলার কাটোয়া |
| দক্ষিণ রাঢ় | বর্ধমানের দক্ষিণাংশ, হুগলি ও হাওড়া |
| তাম্রলিপ্ত | হরিকেলের দক্ষিণে বর্তমান মেদিনীপুর জেলার তমলুক |
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শনের দিক দিয়ে সমৃদ্ধ প্রাচীন জনপদ ছিল- পুন্ড্র। এর রাজধানীর নাম ছিল পুণ্ড্রনগর/পুণ্ড্রবর্ধন। পরবর্তীকালে এর নাম হয় মহাস্থানগড়। এর সীমানা রংপুর, রাজশাহী, দিনাজপুর, বগুড়া (শর্টকাট- রংরাদিব)। পাথরের চাকতিতে খোদাই করা লিপি (প্রাচীনতম) পাওয়া যায়- পুণ্ড্রতে। পুন্ড্র জাতির উল্লেখ পাওয়া যায় বৈদিক সাহিত্য ও মহাভারতে। প্রাচীন পুন্ড্র রাজ্য স্বাধীন সত্তা হারায় সম্রাট অশোকের রাজত্বকালে।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
কুমিলা জেলায়
নওগাঁ জেলায়
দিনাজপুর জেলায়
বগুড়া জেলায়
গৌড় রাজ্য: বাংলার পশ্চিম এবং উত্তরাঞ্চল জুড়ে ছিল এর অবস্থান। গুপ্ত রাজাদের অধীনে বড় কোনো অঞ্চলের শাসনকর্তাকে বলা হত 'মহাসামন্ত'। শশাঙ্ক ছিলেন গুপ্ত রাজা মহাসেন গুপ্তের একজন মহাসামন্ত। শশাঙ্ক ৫৯৪ খ্রিষ্টাব্দে গৌড় অঞ্চলে ক্ষমতা দখল করে স্বাধীন গৌড় রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি প্রাচীন বাংলার জনপদগুলোকে গৌড় নামে একত্রিত করেন। শশাঙ্কের উপাধি ছিল রাজাধিরাজ (তিনি ছিলেন অবিভক্ত বাংলার প্রথম স্বাধীন ও সার্বভৌম রাজা।) শশাঙ্ক রাজধানী স্থাপন করেন কর্ণসুবর্ণে। এটি ছিল বর্তমান মুর্শিদাবাদ জেলায়।
গৌড় জনপদ গড়ে উঠেছিল ভাগীরথী নদীর তীরে। গৌড়ের রাজধানী ছিল- কর্ণসুবর্ণ। কর্ণসুবর্ণ এর অবস্থান ছিল বর্তমান মুর্শিদাবাদ জেলায়। গৌড় জনপদের একমাত্র বাংলাদেশের জেলা- চাঁপাইনবাবগঞ্জ। এর সীমানা ছিল চাঁপাইনবাবগঞ্জ, মালদহ, মুর্শিদাবাদ, নদীয়া (শর্টকাট- চাপাই মামুন)। গৌড়ের স্বাধীন নৃপতি ছিলেন গৌড়রাজ শশাংক। শশাঙ্কের শাসনামলের পরে বঙ্গদেশ তিনটি জনপদে বিভক্ত ছিল। যথা পুণ্ড্র, গৌড়, বঙ্গ রাজাদের গৌড়রাজ উপাধির জন্য গৌড় জনপদটি পরিচিতি লাভ করে। ৬৩৭ খ্রিস্টাব্দে রাজা শশাঙ্কের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলায় সৃষ্টি হয়- মাৎস্যন্যায়।
আরো কিছু প্রশ্নঃ
→ প্রাচীন গৌড় নগরীর অংশবিশেষ অবস্থিত- চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায়।
→ শশাঙ্কের রাজধানী মুর্শিদাবাদের কর্ণসুবর্ণের অবস্থান ছিল- গৌড় অঞ্চলে ।
→ রাজা শশাঙ্কের শাসনামলের পরে বঙ্গদেশ বিভক্ত ছিল- ৩টি জনপদে (পুণ্ড্র, গৌড় ও বঙ্গ)।
→ গৌড় অঞ্চলের অনেক শিল্প ও কৃষিজাত দ্রব্যের উল্লেখ পাওয়া যায়-
কৌটিল্যের ‘অর্থশাস্ত্র' গ্রন্থে।
→ তৃতীয় ও চতুর্থ শতকে গৌড়ের নাগরিকদের বিলাস-ব্যসনের পরিচয় পাওয়া যায়-
বাৎসায়নের গ্রন্থে।
→ গৌড় অঞ্চলের সমৃদ্ধি বেশি ছিল-
পাল আমলে।
→ মুসলিম যুগের শুরুতে মালদহ জেলার যে অঞ্চল গৌড় নামে অভিহিত হতো-
লক্ষ্মণাবতী।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
ঐতরেয় আরণ্যক গ্রন্থে সর্বপ্রথম 'বঙ্গ' শব্দের উল্লেখ পাওয়া যায়। প্রাচীন শিলালিপিতে বঙ্গের দু'টি অঞ্চলের নাম পাওয়া যায়। একটি বিক্রমপুর এবং অন্যটি নাব্য (নিচু জলাভূমি) এর সীমানা ছিল ঢাকা, গাজীপুর, ফরিদপুর, খুলনা, বরিশাল, বাগেরহাট, পটুয়াখালী। দেশবাচক বাংলা শব্দের প্রথম ব্যবহার হয় আবুল ফজলের আইন-ই-আকবরি আছে। গঙ্গা ও ভাগীরথীর মাঝখানের অঞ্চলকে বলা হতো বঙ্গ। প্রাচীন বঙ্গ দেশের সীমানার উল্লেখ পাওয়া যায় ড. নীহাররঞ্জন রায়ের "বাঙ্গালির ইতিহাস" নামক গ্রন্থে।
বঙ্গ রাজ্য : দক্ষিণ-পূর্ব বাংলা এবং পশ্চিম বাংলার দক্ষিণাঞ্চল জুড়ে ছিল এর অবস্থান। গোপচন্দ্র, ধর্মাদিত্য ও সমাচারদেব নামে তিন জন রাজা 'মহারাজাধিরাজ' উপাধি গ্রহণ করে স্বাধীন বঙ্গ রাজ্য শাসন করতেন।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
গৌড়
রাঢ়
সমতট
বঙ্গ
হরিকেল জনপদের অবস্থান ছিল বাংলার পূর্ব প্রান্তে। হরিকেল জনপদের রাজধানী ছিল- শ্রীহট্ট (সিলেট)। সীমানা সিলেট থেকে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
বঙ্গের প্রতিবেশী জনপদ হিসেবে সমতটের অবস্থান। গঙ্গা-ভাগীরথীর পূর্ব তীর থেকে মেঘনার মোহনা পর্যন্ত অঞ্চলকে বলা হতো সমতট। সমতটের রাজধানী- বড় কামতা, কুমিল্লা শহর থেকে দূরত্ব- ১২ মাইল। এর সীমানা বৃহত্তর কুমিল্লা ও নোয়াখালী। কুমিল্লার ময়নামতিতে শালবন বিহার অবস্থিত। হিউয়েন সাং-এর বিবরণ অনুসারে কামরূপে সমতট নামে জনপদ ছিল।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
বরেন্দ্র বা বরেন্দ্রী উত্তরবঙ্গের একটি প্রাচীন জনপদ। এ জনপদটি গঙ্গা ও করতোয়ার মধ্যবর্তী অঞ্চলে গড়ে ওঠে। জনপদটির অন্য আরেকটি নাম- বারেন্দ্রী জনপদ। সীমানা ছিল রংপুর, রাজশাহী, দিনাজপুর ও পাবনা জেলা (শর্টকাট- রংয়াদিপ)। পালদের পিতৃভূমি বলা হয়- বরেন্দ্র জনপদকে। বাংলাদেশের প্রথম যাদুঘর “বরেন্দ্র যাদুঘর" রাজশাহীতে প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯১০ সালে।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
হরিকেলের দক্ষিণে অবস্থিত ছিল তাম্রলিপ্ত জনপদ । সপ্তম শতক থেকে এটি দণ্ডভুক্তি নামে পরিচিত হতে থাকে। গ্রিব বীর টলেমির মানচিত্রে বাংলায় 'তমলিটিস' নামে বন্দরনগরীর উল্লেখ পাও যায়, যা বাংলার প্রাচীনতম বন্দর।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
বরিশাল জেলার পূর্ব নাম বাকলা-চন্দ্রদ্বীপ। বাংলার জনপদগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ক্ষুদ্র জনপদ চন্দ্রদ্বীপ। এ প্রাচীন জনপদটি বালেশ্বর ও মেঘনার মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত ছিল। বর্তমান বরিশাল জেলাই ছিল চন্দ্রদ্বীপের মূল ভূ-খণ্ড ও প্রাণকেন্দ্র ।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
মালদ্বীপ
সন্দ্বীপ
বরিশাল
হাতিয়া
রাঢ় জনপদের অপর নাম সূক্ষ্ম (রহস্যময়ী) জনপদ । রাঢ়ের রাজধানী কোটিবর্ষ। সীমানা ভাগীরথী নদীর পশ্চিম তীরবর্তী অঞ্চল ।
কামরূপ জনপদ রংপুর, ভারতের জলপাইগুড়ি ও আসামের কামরূপ জেলা নিয়ে বিস্তৃত ছিল।
Read more